Somoyer Golpo

বদলে যাওয়া আজিমপুর কলোনি !! বাশের ছায়া Azimpur

বাশের ছায়ার সময়টা ছিল আমাদের দিবা স্বপ্নের মত একটা সময়। ৪৫ নাম্বারের সামনে আজব বিল্ডিংয়ের পেছনে ছিল সেই ছাউনিটি । ১০/১২ জন বসতে পারতাম আমরা, বাশ দিয়ে বেঞ্চ এবং বাশেরই ছাউনি। একটা কাঁঠাল গাছের নিচে ছিল আমাদের বাশের ছায়া। রোদ, ঝড়, বৃষ্টি বা ক্ষুধা কোন কিছুই আমাদের আটকে রাখতে পারতো না, তুমুল ঝড়ে মাথায় ছাতি নিয়েও ছুটেছি আড্ডা দিতে। অনেকটা মান্না দে’র কফি হাউজের মত । সময়ের সাথে সাথে অনেকেই এসেছিলেন ওখানে আবার চলেও গেছেন। কত গান, আড্ডায় মাতিয়ে রাখতাম সময়টা । কোন চিন্তা নেই খাও দাও আড্ডা মারো।

আমার এখোন মনে আছে আমরা যখন ৪৫য়ের সামনে ক্রিকেট খেলতাম তখন সুজনের বাবা আমাদের রানের হিসেব রাখতেন । আরো মুরুব্বিরা ছিলেন তার সাথে, মাঝে মাঝে মুরুব্বিদের মাঝেও ঝগড়া বেধে যেত আমাদের খেলা নিয়ে। তাদের বাসা থেকে চা নাস্তাও পেতাম আমরা । খেতে দিলে শুতে চায় তেমন একটা বিষয়, আমরা ভাবলাম খেলাতো চলছেই এবার বসার জায়গা করি । আমাদের মাঝে তখন এসব কাজ করার দারুন একটা গতি ছিল, সাথে সাথেই কাজ শুরু করে দিলাম, থ্রি-স্টার থেকে বাশ নিয়ে আসা হলো, নেতা হিসেবে আমাদের দেখভাল করলেন পাভেল ভাই। বাশ দিয়ে বসার জায়গা বানানো হলো, আসে পাশের জায়গা থেকে ছোট ছোট ফুল গাছ এনে লাগানো হলো। তবে ফুলের গাছগুলো মালিককে বলে আনা হয়নি।
ছোট, বড় সবাই এক সাথে আড্ডা শুরু হলো বাশের ছায়াতে। ওখানে অনেকের ভালোবাসার মানুষ জুটে গেল আবার বিচ্ছেদও হলো। গাতক সবুজ ভাই গান করতেন আমরাও গাইতাম, তবে সবুজই বেস্ট ছিল। তার একটা গান ছিল মায়াবিনী কাল সাপিনী। নারী বিদ্বেষী গান গাইতে গাইতে ছেলেটা হুট করে বিয়ে করে ফেললো। সে অবশ্য এখন আর ওই গানটা গায় না।

প্রতি ইদেই ৪৫ নাম্বারের সামনে আমরা গান বাজাতাম কিশোর, জগজিত, লাকি আখন্দ, জেমস !!! আহা কি দিন ছিল । কোরবানির ইদে গরু রাখা হতো, সারারাত জেগে থাকতাম । এর ভেতরে আবার আমাদের ঝগড়া ঝাটিও ছিল, রাসেদ ভাই আবং ফিরোজ ভাই ছিল মানুষকে উত্তেজিত করতে সেরা। রাসেদ ভাই এমন একটা জিনিস ছিল তার একটা মুচকি হাসি দেখলেও অনেকে ক্ষেপে যেত। কদিন পরপর কবির ভাই রেগে চলে যেতেন বাসায়। যাবার সময় মির্জা সাহেবকে পেছন থেকে আমরা বিভিন্ন রকম শব্দে চিতকার করে ডাকতাম, তাতে তার রাগ আরো বেরে যেত। একদিনতো এই চিতকার শুনে পাভেল ভাইয়ের বাবা হাতে দা নিয়ে বাসা থেকে ছুটে এসেছিলেন, তিনি ভেবে ছিলেন তার ছেলেপুলেদের কেউ মারতে এসেছে।
আমরা প্রতি সপ্তাহে একজনকে রাগিয়ে বাসায় পাঠাতাম। রাসেদ ভাইয়ের মোচে হাত দিলে মনে হতো কেউ তার লিভার ছিরে নিচ্ছে। একদিন সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো জোর করে ধরে রাসেদের মোচ কেচি দিয়ে কেটে দেবো। যেমন কথা তেমন কাজ ৭/৮ জন তাকে ধরে ফেললাম আর একজনার হাতে কেচি, ওমা সে কি !!! রাসেদ ভাই পুরা আজিমপুর মাথায় তুলে ফেললেন চিল্লা-চিল্লি করে, রাগারাগি করে সোজা বাসায় চলে গেলেন, অনেকটা বাংলা সিনেমার নায়িকারা ভিলেনদের থেকে মুক্তি পেয়ে যা করে আর কি। ছেলেটা মাস দুয়েক আড্ডা মারতে আসে নাই। পরে তার বাসায় গিয়ে অনেক অনুনয় বিনয় করে তাকে আনা হয়েছিল।

তার কিছুদিন পরেই বাশের ছায়ায় হঠাত বেশ কিছু অলৌকিক বিষয় আমরা খেয়াল করলাম। প্রতিদিন রাত ৯টার দিকে একধরনের আতরের গন্ধ আমরা পেতে শুরু করি। প্রথম দুই তিন দিন আমরা তেমন একটা গুরুত্ব না দিলেও কিছুদিন পর বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুললো আমাদের। সেই সময় রাত ১০টার দিকে আমরা আজব বিল্ডিংয়ের পেছনে জংলি পথে হেটেছি কবরস্থান পর্যন্ত আতরের গন্ধ পাই কিন্তু প্রেতাত্মা, জিন, ভুত পাই না। আশে পাশের গাছে কিছু আছে কিনা খুজে দেখলাম, মাটিতে পরে থাকা ময়লা পর্যন্ত আমরা সরিয়ে দেখেছি, পুরাই ফেলু দা!!! ফিরোজ ভাই আবার অলৌকিক বিষয়ে বেশ জ্ঞান রয়েছে। ফিরোজ ভাইর থেকে জানতে পেলাম যে, আজিমপুর কলোনির উপর থেকে একটা রাস্তা আছে যেটা দিয়ে অনেক পুরানো আত্মারা চলাফেরা করে। আমরা বেশ ঘাবরে গেলাম, এই আত্মা আমাদের ক্ষতিও করতে পারে, তাই না ??? বেশ কদিন চললো আমাদের তল্লাশি কিন্তু আতরের গন্ধ পাই, আত্মা, জিন বা ভুত কিছুই পাই না। তারপর আমরা আত্মা বিশেষজ্ঞ ফিরোজ ভাইয়ের নেতৃত্ব গেলাম পার্টি হাউজ মসজিদের হুজুরের কাছে, পুরো বিষয়টি খুলে বললাম। তিনি শুনলেন, হেসে উড়িয়ে দিলেন এবং পরে আমরা জানতে পেরেছিলাম কিসের আত্মা !!! আজব ডিল্ডিংয়ের নিচতলায় এক হুজুর বেড়াতে এসেছিল তার শরীর থেকে আতরের গন্ধ আসতো । তখন বুঝলাম আর আত্মা খোজার দরকার নেই আমাদের সাথেই আত্মারাম আছে ওরফে ফিরোজ ভাই। তবে ফিরোজ ভাই ছবি আকা, আলপনা ইত্যাদি শিল্পীকর্ম খুব ভালো করতেন। তার দুইজন ফলোয়ার ছিলাম আমি আর নাহিদ বিভিন্ন বাড়িতে আমাদের ডাক পড়তো আলপনা করতে আর স্টেজ সাজাতে।

কাচা আম, ডাব হরদোম লুট করতাম আশ পাশের গাছ থেকে, এমন কি সিএমবির বারান্দা থেকে জ্বলন্ত লাইট সুজন খুলে এনেছিল ব্যাডমিন্টন খেলতে। সুজন ছিল আন প্রেডিকটেবল এবং আন প্রটেকটেবল, কইয়া হালছি তো কইরা হালছি । যাই হোক ৪৫ নাম্বার বিল্ডিংয়ের পেছন থেকে একবার পেপে চুরি করে খেলাম সবাই । আবার সেই পেপে গাছের নিচেই পেপের ছোলা গুলো রেখে আসলাম। পরের দিন সেই গাছের মালিক আমাদের সাথে এসে বসলেন এবং বললেন কালকে আমার গাছের পেপে কে যেন চুরি করছে। আমাদের সবার মুখ খানিকটা শুকিয়ে গেল। তারপর বললো আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিছি পেপের জন্য । আমরা অবাক, হতবাক !!! একটা পেপের জন্য আল্লার কাছে বিচার !!! যাই হোক আমরা ভুল বুঝতে পারলাম এবং তার নাম দিলাম পেপে মামা।

কোন এক ক্রিকেট খেলার শেষে সেন্টার মাঠের পাশে টেংকিতে সবাই বসলেন। মামুন ভাই (৪৬) আমি আর নাহিদ খসরু ভাইয়ের একটি ব্যাট মেরে দিলাম। পরের দিন সেটায় সাদা রং করে পুরাই পালটে ফেললাম এবং সেটা দিয়ে খেলা শুরু করলাম। চলছিলো ভালোই , কিন্তু হঠাত একটি খেলায় আবার খসরু ভাই আসলেন এবং ব্যাটটা দেখে চিনে ফেললেন শুধু তাই না খসরু ভাই কেরোসিন তেল এনে ব্যাটে ঢেলে দিল এবং আসল চেহারা বেরিয়ে এলো !!! হায় খসরু ভাইয়ের মতো একজন ভদ্রলোকের কাছে এমন কাজ আসা করা যায়না !!! আমরা অবস্য এর আগেই ওখান থেকে কেটে পড়েছিলাম । সেদিন বুঝতে পারলাম চুপচাপ মানুষগুলোকে কখনো খোচাতে নেই, এরা অতিরিক্ত চালাক হয়।

আমি একটা বিশেষ কাজে ব্যস্ত থাকতাম সবসবময়, মাঝে মাঝেই আগুন জ্বালাতাম বাসের ছায়ার পাসে। আগুনের রং এবং মোশন আমার দেখতে খুব ভালো লাগে। আশেপাশে পড়ে থাকা শুকনো পাতা এবং গাছের ডাল আমি কুড়িয়ে জালাতাম। পাতা এবং গাছের ডাল ফুরিয়ে গেলে বাগানগুলোর ব্যাড়ায় হাত দিতাম । আজব বিল্ডিংয়ের পেছনে বাবু ভাইয়ের বাগানের অর্ধেক ব্যাড়া আমি পুড়িয়েছি। বাবু ভাই আবার পরের দিন চিতকার চেচামেছি করতেন, কে করেছে এই কাজ ??? সবুজ ভাই জেনেও কিছু না জানার ভান করতেন, বাবু ভাই আবার তার আত্বীয়তো। সরি বাবু ভাই 🙂
নাহিদ ছিল আমাদের ক্রিকেট খেলার ম্যনেজার। নাহিদ পকেট থেকে টাকা খরচ করতো এবং সবার শেষে ব্যাটিং করতো। অনেক টুর্নামেন্ট নাহিদের অবদান ভুলে যাবার নয়। আরো অনেকেই ছিল রাসেল ভাই, মনির ভাই, আলাউদ্দিন ভাই, টুটুল ভাই, হিমন ভাই, আসফাক ভাই, রনি, জুম্মাণ, সুমন, কাইয়ুম, রিয়াজ, পলাস, পিয়াস, কায়েস, রাসেল, কাওসার সবাই মিলেমিশেই থাকতাম। নিজেদের সমস্য নিজেরাই সমাধান করে নিত

সেই সময় আমাদের সব কিছুই ছিল বাশের ছায়াকে কেন্দ্র করে। একটা সময় বাশের ছায়াটিতে আধুনিকতার ছােয়া লাগে, পাকা করি বাসের ছায়াটিকে। ইট, বালু এবং সিমেন্টে চাপা পরে যায় আমাদের ছেলে খেলা । আমরা একে একে যুক্ত হই জীবন যুদ্ধে, স্মৃতি হতে শুরু করে আমাদের প্রতিদিনের গল্প। বলতে দ্বিধা নেই কেমন জেন হয়ে গিয়েছি আমরা, সময়ের সাথে সাথে পালটে যেতে শিখেছি আবার ভুলেও যেতে শিখেছি। কিন্তু আমরা ভুলে যাবার কে ???

Comment

comments

What's your reaction?

Excited
0
Happy
0
In Love
2
Not Sure
0
Silly
0

Comments are closed.

Next Article:

0 %