Somoyer Golpo

আজিমপুর দায়রা শরীফ । Azimpur dayra Sharif

আজিমপুর দায়েরা শরীফ খানকাহ এর ঐতিহাসিক মাজার, যা সাধারণত বড় দায়েরা শরীফ নামে পরিচিত, ঢাকা শহরের আজিমপুর এলাকায় অবস্থিত। ফার্সি শব্দ দায়েরা মানে “বৃত্ত” বা “কাজের এলাকা”। নিয়ম অনুযায়ী, দায়েরা শরীফের উত্তরাধিকারীরা কখনোই তীর্থযাত্রা ছাড়া এলাকার বাইরে যান না।

আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সাহাবায়ে আজমাইনদের পর ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজ সারা বিশ্বে আলেম, ওলামা, পীর মাশায়েফ আউলিয়ায়ে কেরামদের মাধ্যমেই হয়েছে। এদেশে সাহাবায়ে আজমাইনদের আগমন না ঘটলেও রসূল (স.) এর পরিবারের সদস্যগণ ও আউলিয়ায়ে কেরামদের আগমনের দ্বারা পাক-ভারত বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে। বাংলাদেশে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ঐতিহাসিক আজিমপুর দায়রা শরীফ এর খেদমত উল্লেখযোগ্য।

এই উপমহাদেশে আগত প্রসিদ্ধ বার আউলিয়ার অন্যতম মহান ওলী শাহ সূফী সাইয়্যেদ মোহাম্মদ বখতিয়র মহীসাওয়ার (রহ.) বাগদাদ হতে আগমন করেন। মত্সপৃষ্ঠে আরোহন করে তরঙ্গময় উত্তাল সমুদ্র অতিক্রম করে এদেশে আগমন করায় তিনি মাহী সাওয়ার উপাধীতে পরিচিত। তিনি এদেশে আগমনের পর বর্তমান চট্টগ্রাম শহরের নিকটবর্তী কালুর ঘাট ব্রীজের নিকটস্থ হালদা নদীর তীরে অবস্থান করেন। হযরত বখতিয়ার মাহী সাওয়ার (রহ.) ছিলেন আল্লাহর মাহবুব আখেরী নবী (স.) এর প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা ফাতেমা (রা.) এর বংশধর। তার বিবি সাহেবা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এর ঔরসে দুই সাহেবজাদা জন্ম গ্রহণ করেন। হযরত সাইয়্যেদ জাহানশাহ (রহ.) এবং হযরত সাইয়্যেদ মো. হায়া শাহ (রহ.)। মোহাম্মাদ বখতিয়ার মাহী সাওয়ার এর দ্বিতীয় পুত্র হযরত সাইয়্যেদ হায়া শাহ এর বংশেই আবির্ভাব হন আজীমপুর দায়রা শরীফের মহান তাপস হযরত শাহসূফী সাইয়্যেদ মোহাম্মদ দায়েন (রহ.)। হিজরী দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শাহসূফী সাইয়্যেদ দায়েন (রহ.) চট্টগ্রাম জেলার মধ্যবর্তী খাইয়ারা নামক স্থানে জন্ম গ্রহন করেন। জীবনের শুরুতেই দ্বীন শিক্ষার পাশাপাশি তরিকতের শিক্ষালাভে ধন্য হয়ে কঠোর সাধানার মাধ্যমে তত্কালীন চট্টগ্রামের শাহ আমানত খান মুজাদ্দেদীর নিকট যুবক অবস্থায় বাইয়াত গ্রহণ করেন। অতঃপর ভারতের পাটনাস্থ হযরত মাখদুম শাহ মোঃ মোনায়েম (রহ.) এর শীর্ষত্ব গ্রহণ এবং আল্লাহর খাস মেহেরবানীতে অক্লান্ত সাধনা ও আন্তরিক একাগ্রতা সহ একাধারে বার বত্সর ক্রমশঃ তার প্রতি আকৃষ্ট ও দয়া পরবশ হয়ে একদা গভীর রাতে হযরত শাহ মাখদুম (রহ.) হযরত সুফী দায়েন সাহেবকে বললেন, বাবা দায়েন তুমি যদি আমার দেয়া চারটি শর্ত পালন করতে সম্মত হও তবেই তোমার জন্য আমি কিছু করার চেষ্টা করতে পারি। শর্তগুলো হল- ১. দায়রাবন্দী অবস্থায় ঢাকা শহরে অবস্থান করবে। ২. আল্লাহর ওপর সর্ব বিষয়ে এবং সর্বাবস্থায় তাওয়াক্কুল করবে। ৩. বিবাহ করবে। ৪. অবস্থান স্থলে আম, লঙ্গর, কাঙ্গাল, দুঃখী ও সাধারনের ভোজ খানার প্রচলন করবে। স্বীয় মোর্শেদের নির্দেশে চট্টগ্রামে তত্কালীন শাহ আমানত (রহ.) এর দরবারে খান আমানত শাহ মুজাদ্দেদী (রহ.) নির্দেশ করলে শাহ সূফী দায়েম (রহ.) বলেছিলেন, হযরত, আমি ঢাকা শহরের কোথায় যাইব? মোর্শেদ তাকে আদেশ করলেন তুমি চট্টগ্রামস্থ লাল দীঘিতে ডুব দাও, অতঃপর (ঢাকার) যেই স্থানে উঠবে সেই এলাকায় দ্বীন প্রচারে নিজেকে মশগুল করবে। তদানুযায়ী আমল করলে মাত্র একই ডুবে ঢাকার আজিমপুর একলাকায় জনাকীর্ণ স্থানের একটি পুকুরে ভেসে উঠলেন। হযরত শাহ দায়েম (রহ.) আনুমানিক ১৭৬৬ খ্রিস্টাব্দ ১১৮০ হিজরিতে ঢাকায় এসে প্রথমতঃ লালবাগ কেল্লার পশ্চিমে অবস্থিত আমলি গোলাস্থ ঐতিহাসিক খান মোহাম্মাদের সমজিদে অবস্থান করেন। একদা তিনি উক্ত সমজিদে থেকে শাহ ফয়জুল্লাহ কর্তৃক ১১৬০ হিজরী সালে নির্মিত বর্তমানে আজিমপুর কবর স্থানের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত দ্বিতল মসজিদে চলে আসলেন। দ্বীতল মসজিদে অবস্থানকালে ক্রমে ক্রমে লোকের ভীড় বেড়ে যাওয়ায় আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে তিনি একদা রাত্রি কালে আজিমপুর কবরস্থান সংলগ্ন গভীর জঙ্গলে এক প্রকাণ্ড বৃক্ষের নীচে খাদেম মাহী শাহ সহ অবস্থান গ্রহণ করেন। উল্লেখ্য যে দায়রা শরীফের গদীঘরটি উল্লেখিত স্থানেই অবস্থিত। দায়রা শরীফ খানকাহের প্রতিষ্ঠাতা হযরত শাহসূফী সাইয়্যেদ মোহাম্মদ দায়েন এর ইন্তেকাল ১২১৪ হিজরী পহেলা শাবান। তার পরবর্তী গদ্দীনশীনগণ হলেনঃ শাহসূফী সাইয়্যেদ আহমদুল্লাহ, শাহ সূফী সাইয়্যেদ লক্কীতুল্লাহ। শাহসূফী সাইয়্যেদ মাজহারুল হক ওয়ালী উল্লাহ, শাহসূফী সাইয়্যেদ খলিলুল্লাহ, সৈয়দ লক্কিতুল্লাহ সানি শাহসূফী সাইয়্যেদ ওয়ালীউল্লাহ ওরফে শাহজাহান, শাহসূফী সাইয়্যেদ ফজলুল্লাহ ওরফে শাহ আলী শাহসূফী সাইয়্যেদ সাইফুল্লাহ যিননূর। সর্বশেষ বর্তমানে সৈয়দ শাহ্ আহমদ উল্লাহ যোবায়ের গদিনশীন আছেন আজিমপুর দায়রা শরীফের প্রতিষ্ঠাতা শাহসূফী সাইয়্যেদ মোহম্মাদ দায়েম (রহ.) এর সপ্তম অধঃস্তন পুরুষ এবং দশম গদিনশীন। ৯৮ সনে শাহসূফী সাইয়্যেদ ওয়ালী উল্লাহ ওরফে শাহজাহান (রহ.) এর ঔরসে হাজী মোসাম্মত্ জাহান আরা বেগমের গর্ভে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ ১৩৬৭ হিজরী সালের ১১ই রমজান আজিমপুর দায়রা শরীফে জন্ম গ্রহণ করেন।

Comment

comments

What's your reaction?

Excited
0
Happy
0
In Love
0
Not Sure
0
Silly
0

Comments are closed.

Next Article:

0 %