বাংলাদেশে নিউ মিডিয়ার হামলা

0

সকালে ওঠে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দিয়ে পত্রিকা পড়ার মজাই আলাদা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তথ্য প্রযুক্তি উৎকর্ষতার যুগে পত্রিকা পড়ার অভ্যাসটা বদলে যাচ্ছে! ইট-পাথরের এই ব্যস্ত জীবনে হাতে কাগজ নিয়ে চা পান করতে করতে পত্রিকা পড়ার বিষয়টা দৃশ্যত্য অনেকটাই কম । অন্তত নগর জীবনে এমনটাই হতে শুরু করেছে। সময়ের বিবর্তনে ‘গতানুগতিক’ গণমাধ্যমের ওপর মানুষের নির্ভরতা কমছে। সেখানটা দখল করে নিচ্ছে ‘নিউ মিডিয়া’ ও অনলাইনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো।

এখন, প্রশ্ন আসতেই পারে এই নিউ মিডিয়া আসলে কি? কিভাবে মূল ধারার গণমাধ্যেমকে সরিয়ে দিয়ে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যাচ্ছে বহুগুণে। মূলত মূলধারার মিডিয়া অর্থাৎ সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা বেতার, একইসঙ্গে হালের অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলো ছাড়া অন্য যে মাধ্যমগুলো থেকে আমরা তথ্য পাচ্ছি বা তথ্য আদান-প্রদানে ব্যবহার করছি তাই হলো নিউ মিডিয়া।

রবার্ট লোগান তার ‘আন্ডারস্ট্যান্ডিং নিউ মিডিয়া’ বইতে লিখেছেন, নিউ মিডিয়া হলো সেটাই যেখানে সংবাদ খুব দ্রুত তৈরী করা যায়, দ্রুত রুপান্তরের পাশাপাশি সহজে অনুসন্ধান এবং অ্যাক্সেস করা যায়। নতুন মিডিয়া এবং পুরানো মিডিয়াগুলির মধ্যে একটি পার্থক্য হ’ল পুরানো মিডিয়া বেশিরভাগ অংশ প্রচলিত গণমাধ্যমের জন্য। এছাড়াও, নতুন মিডিয়াগুলির প্রতিটি ফর্ম অত্যন্ত ইন্টারেক্টিভ, যদিও প্রচলিত গণমাধ্যমগুলি এমন নয়। নতুন মিডিয়া নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা করা অধ্যাপক লেভ মানোভিচ নতুন মিডিয়াকে কম্পিউটারের উপর নির্ভরশীল হিসাবে বর্ণনা করেছেন। সম্পাদক লিসা গিটেলম্যান এবং জেফ্রি পিংগ্রির মতে ‘নতুন মিডিয়া সামাজিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক রূপান্তর প্রতিবিম্বিত করে।‘

মানোভিচ তাঁর নতুন বই “নিউ মিডিয়া ফর্ম বোরজেস টু এইচটিএমএল,” প্রবন্ধে নতুন মিডিয়া সম্পর্কে বেশ কয়েকটি রূপরেখা দিয়েছেন। এই রূপরেখাগুলো নতুন মিডিয়াটিকে ডিজিটাল এবং সাংস্কৃতিক ভাব হিসাবে প্রকাশ করে। যেমন, সাইবারকালচার হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যেম অনলাইন বা মুঠোফোনের বিভিন্ন বিষয় ব্যবহার। নতুন মিডিয়া এমন নতুন সম্ভাবনার সাথে সম্পর্কিত যেখানে নেটওয়ার্ক যোগাযোগ ও প্রযুক্তির সংমিশ্রণ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ মাল্টিফেসেটেড অ্যান্ড মাল্টলিংচুয়াল স্টাডিজ অনুসারে নতুন মিডিয়া বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে দূরত্বকে হ্রাস করেছে। এখন, লোকেরা যে কোনও সময় এবং যে কোনও জায়গায় একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

নিউ মিডিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো ইন্টারনেট নির্ভর ও ডিজিটাল মিডিয়া। ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা ফেইসবুক ও ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করা টুইটার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহূত নিউ মিডিয়ার উদাহরণ। এর সঙ্গে রয়েছে ইন্সটাগ্রাম, লিংকডইন, ইউটিউব আর লাখ লাখ ব্লগ।

নিউ মিডিয়া তৈরীর মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষ যখন সব মাধ্যেমে বিচরণ শুরু করে তখন সে তার ক্ষমতাকে অনুধাবন করে নতুন করে। এর ফলশ্রতিতে শত বছরের পাঠক সমাজ তথ্য গ্রহণকারীর ভূমিকা থেকে বের হয়ে তথ্য প্রদানকারী বা নিজেই সংবাদদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়। উদ্ভব হয় সিটিজেন জার্নালিজম বা নাগরিক সাংবাদিকতার। এরই ফলশ্রতিতে আমরা দেখতে পাই নিউ মিডিয়া ব্যবহার করেই তিউনিসিয়ায় জ্বলে ওঠে আরব বসন্তের প্রথম স্ফুলিঙ্গ, যদিও আরব বসন্ত আসলে আরব দেশগুলোর জন্য ‘বসন্ত’ ছিল কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে, সেটি ভিন্ন ডিসকোর্স বলে আপাতত একপাশে সরিয়ে রাখা যায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশে ২০১৩ সালের গণজাগরণ, সবই কিন্তু সম্ভব হয়েছিল প্রাথমিকভাবে নিউ মিডিয়াকে কোনো না কোনোভাবে কিন্তু একইসঙ্গে সফলভাবে ব্যবহারের ফলে।

নিউ মিডিয়ার ওপর সাধারণ মানুষের আগ্রহ কেন এতো আগ্রহ এটি আরেকটি বড় প্রশ্ন। একটু ভেবে দেখলেই এর উত্তর পাওয়া যায়, যেকোনো ধরনের এজেন্ডা নির্ধারণে মূল ধারার মিডিয়াগুলোই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে দেখা যেতো। সেখানে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগই ছিলই না। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষতার ফলে এজেন্ডা নির্ধারণের জন্য মানুষ এখন আর গণমাধ্যমের ওপর তেমন নির্ভরশীল নয়। এখন ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তারা নিজেরাই এজেন্ডা ঠিক করে নিতে পারছে। নিজেদের মত প্রকাশ করতে পারছে। উদাহরণ স্বরুপ বলা যায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে, দুই রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ফেসবুকের মাধ্যমে নিজস্ব অনুসারী তৈরি করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে নিজেদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যগুলো প্রচারে তাঁরা যতটা না গণমাধ্যমের সহায়তা নিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি সহায়তা নিয়েছেন নিজস্ব ফেসবুক পেজের।

এখন বিভিন্ন টক-শো বা অনুষ্ঠানে দর্শকদের যে সুযোগ দেওয়া হচ্ছে তা সময়ের দাবি, যে দাবিগুলো মূলধারার মিডিয়া এড়িয়ে গেলে তা তাদের জন্যই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতো। তাই নিউ মিডিয়ার উত্থানে মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে নানা ধরনের পরিবর্তন আসছে। মূলধারার গণমাধ্যমগুলো বাধ্য হচ্ছে নিউ মিডিয়ায় তথা ফেইসবুকে, ইউটিউবে তাদের আধেয় প্রকাশ করতে, অনলাইনে আসতে এবং সর্বোপরি তারা সুযোগ করে দিয়েছে নাগরিক সাংবাদিকতার। এখানেই নিউ মিডিয়ার সম্ভাবনা আর অনন্যতা।

নিউ মিডিয়ার উত্থানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ আক্ষরিক অর্থেই তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষমতার স্বাদ আস্বাদন করেছে। হয়ত এর ফলে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে গিয়েছে, কিন্তু ব্যাপক অর্থে এর দ্বারা সাধারণ মানুষের এক ধরনের ক্ষমতায়ন হয়েছে তা নিশ্চিত। দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তথাকথিত ‘তৃতীয় বিশ্ব’-এর জনসাধারণ পশ্চিমা মূলধারার গণমাধ্যমের একপেশে সংবাদ থেকে যে মুক্তি চাচ্ছিল তা নিয়ে এসেছিল নয়া মাধ্যমগুলোর উত্থান। তবে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে নিউ মিডিয়াও হয়ত বেশিদিন সাধারণ মানুষের থাকবে না। সেক্ষেত্রে নিউ মিডিয়ারও আরেক ফ্রাঙ্কেস্টাইনে পরিণত হওয়া ঠেকানোর বা নতুন কোনো বিকল্পের কথা ভাবা উচিত নয় কি?

লিখেছেন : সাহাদাত হোসেন

Comment

comments

Comments are closed.