সেমিকন্ডাক্টর এর ইতিহাস

0

বর্তমান যুগ হল ইলেক্ট্রনিক্সের যুগ। আর আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্সের প্রধান ভিত্তি হল সেমিকন্ডাক্টর ( Semiconductor )। সেমিকন্ডাক্টর এমনি একটি উপাদান যার ভিতরে একই সাথে বিদ্যুৎ পরিবাহী ও অন্তরক এর ধর্ম বিদ্যমান(সিলিকন, জারমেনিয়াম, সেলেনিয়াম, কার্বন, ইত্যাদি)। আমাদের জীবনের সবক্ষেত্র ইলেক্ট্রনিক্সের জন্য সহজ থেকে সহজতর হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন কম্পিউটার ছিল একটা অডিটোরিয়ামের সমান, রেডিও, টিভি ছিল বিশাল আকারের। আজ সব হাতের মুঠোতে এনে দিলো Transistor, Integrated circuit- এর মত কিছু ইলেক্ট্রনিক্স কম্পোনেন্ট। কিভাবে আবিস্কার হল এই সেমিকন্ডাক্টর?
১৮৩৩ সালে প্রথম সেমিকন্ডাক্টরের গুনাগুণ বিজ্ঞানী মাইকেল ফ্যারাডে বর্ণনা করেন। বেনজিন নিয়ে কাজ করার সময় তিনি প্রথম সেমিকন্ডাক্টরের অস্তিত্ব নিরীক্ষণ করেন। ১৮৩৩ সালে তিনি দেখেন যে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিদ্যুৎ পরিবাহী ক্ষমতা বাড়ে যা ধাতুর ধর্মের বিপরীত। তার বিখ্যাত বই “Experimental Researches in Electricity” তে তিনি বলেছেন, “I have lately met with an extraordinary case…. Which is in direct contrast with the influence of heat upon metallic bodies.. on applying a lamp …the conducting power rose rapidly with the heat… On removing the lamp and allowing the heat to fall, the effects were reversed.” তার ভাষ্যমতে, তিনি এক অদ্ভুত অসাধারণ ঘটনা দেখেন যে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে পরিবাহী ক্ষমতা বাড়ে এবং তাপমাত্রা কমার সাথে সাথে এই প্রক্রিয়া বিপরীত হয় যা কোন ধাতব শরীরে তাপমাত্রার প্রভাবের বিপরীত।

Semiconductor01
এভাবেই সেমিকন্ডাক্টরের যাত্রা শুরু। ১৮৩৯ সালে এ.ই.বিকিউরেল ফটোভোলটাইক ক্রিয়া, ১৮৭৪ সালে কার্ল ফারদিনান্দ ব্রাউন রেকটিফিকেসন পর্যবেক্ষণ করেন। ১৮৭৮ সালে এডউইন হার্বার্ট হল চৌম্বক ক্ষেত্রে বহমান চার্জ ক্যারিয়ারের পরিবর্তন প্রদর্শন করেন যা “হল এফেক্ট” নামে পরিচিত। এরপর ১৮৯৭ সালে জে.জে. থমসনের ইলেকট্রন আবিস্কারের পর ইলেকট্রনের উপর ভিত্তি করে পরিবাহী ক্ষমতার মতবাদ হয়। এরপর ১৯১৪ সালে জোহান কয়েনগসবার্জার প্রথম কঠিন উপাদানগুলোকে ধাতু, অন্তরক এবং পরিবর্তনশীল পরিবাহী এই তিনটি ভাগে বিভক্ত করেন। ১৯২৮ সালে ফেলিক্স ব্লছ ইলেকট্রনের গতিবিধি সম্পর্কে মতবাদ দেন। ১৯৩১ সালে যখন অ্যালান হেরিচ উইলসন পরিবাহী ক্ষমতার ব্যান্ড তত্বে ব্যান্ডের খালি জায়গা সম্পর্কে ধারণা দিলেন তখন সেমিকন্ডাক্টর সম্পর্কে ধারণা আর এক ধাপ এগিয়ে গেল। এরপর ওয়ালটার এইচ শটকী এবং নেভিল ফ্রাঞ্চিস মট ‘ধাতব সেমিকন্ডাক্টর জংশন’ এর চরিত্র বর্ণনা করেন। এরপর ১৯৩৮ সালে বরিশ ডাভইদভ রেকটিফায়ার, পি-এন জংশন এবং সংখ্যালঘু চার্জ বাহক সম্পর্কে মতবাদ দেন। এরপর জন বার্ডেন ধারণা দেন কিভাবে অল্পকিছু অপদ্রব্য মিশালে সেমিকন্ডাক্টরের ধর্ম নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন হয়। সেমিকন্ডাক্টরের ধারণা এভাবে আস্তে আস্তে উন্নত হতে থাকে এবং সেমিকন্ডাক্টর দ্বারা বিভিন্ন কম্পোনেন্ট তৈরি হওয়া শুরু হয়। জার্মান বিজ্ঞানী ফারদিনান্দ বারুন ১৮৭৪ সালে লেড সালফাইড নিয়ে কাজ করার সময় দেখেন যে মুক্তভাবে বিদ্যুৎ প্রবাহ একটি দিকেই হচ্ছে। আসলে তিনি ঐ সময় রেকটিফিকেশনের এফেক্ট আবিষ্কার করেছিলেন। ১৮৭৬ সালে তিনি প্রথম সেমিকন্ডাক্টর ডায়োড তৈরি করেন কিন্তু ইহার কোন কার্যকরী ব্যবহার পাওয়া গেলো নাহ। বিজ্ঞানী সি.ই.ফিটস ১৮৮৬ সালে কারেন্ট রেকটিফায়ার তৈরি করেন। তখন এটির আবিষ্কারের বাস্তব কোন ব্যবহার না পাওয়া গেলেও ১৯৩০ সালে এসি ভোল্টেজকে ডিসি ভোল্টেজে রুপান্তর করার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা হয়। ১৯০১ সালে বাঙ্গালী বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু রেডিও সিগন্যাল খোঁজার জন্য সেমিকন্ডাক্টর ডায়োড ব্যবহার করেন। এরপর ১৯২০ সালে রেডিওতে ভ্যাকিউম টিউবের ব্যবহারকে বন্ধ করে সেমিকন্ডাক্টর ডায়োড। তারপর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় পুনরায় বেতারতরঙ্গ এর কম্পাঙ্ক চালনা করার জন্য এর বৈশিষ্ট্য সবার নজর কারে। এরপর ১৯০৭ সালে এইচ.যে. রাউন্ড এল.ই.ডি আবিষ্কার করেন। সেমিকন্ডাক্টর দ্বারা তৈরি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট হল ট্রানজিস্টার। ১৯৪৭ সালে জন বারডেন, ওয়ালটার ব্রাটাইন, উইলিয়াম শকলিই ট্রানজিস্টারের উদ্ভভাবন করেন। ইহাকে ইলেক্ট্রনিক্সের হৃদয় বলা হয় এবং এটি বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন ছিল। এরপর ১৯৫৭-১৯৫৯ সালের মধ্যে ইনটিগ্রেটেড সার্কিটের আবিষ্কার হয় একইসাথে ফেয়ারচাইল্ড এবং টেক্সাস কোম্পানিতে। জাক কিলবি টেক্সাস কোম্পানিতে এবং রবার্ট নয়ছ ফেয়ারচাইল্ডে এর বিকাশ ঘটান।
এভাবেই সেমিকন্ডাক্টরের উত্থান থেকে আধুনিক ইলেক্ট্রনিক্সকের জন্ম হয়েছে। এখন আমাদের জীবনের সবক্ষেত্র আজ ইলেক্ট্রনিক্সের উপর নির্ভরশীল। বস্তুত, ইলেক্ট্রনিক্স ছাড়া আজ চলা অসম্ভব। আমার শিক্ষক বলেছিলেন, “যদি ইলেক্ট্রনিক্সকে জানতে পার তাহলে বুঝবে…..তুমি না থাকেলে সকালটা এত মিষ্টি হত না…এই তুমি সেই তুমি না এই তুমি হল ইলেক্ট্রনিক্স।

Comment

comments

Comments are closed.